বিপ্লব বসু

 বিপ্লব ভূষণ বসু

সংক্ষিপ্ত জীবনী

বিপ্লব ভূষণ বসুর সাথে আমার পরিচয় ১৯৯০ সালে। তখন তিনি বসতেন কালীঘাট রোডের তাঁদের নিজস্ব বাড়িতে। সেখানেই একটি ঘরে স্কুল অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের অফিস ছিল। সে সময় এসএফআর জাতীয় পরিবেশ সচেতনতা প্রচার অভিযানের পূর্বাঞ্চলের কোঅর্ডিনেটিং এজেন্সি। আমি জলপাইগুড়ি সায়েন্স ক্লাবের পক্ষ থেকে ওনার সাথে যোগাযোগ করি ও পরিচয় হয়। পরে আমি নিজেই এস এফ আর এর একজন সদস্য হিসাবে সংস্থায় যোগ দিই ও বিপ্লবদার সাথে কাজের সূত্রে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।

 আমাদের মধ্যে নানা বিষয়ে প্রচুর আলোচনা ও গল্প হলেও বিপ্লব বসুর আগের জীবন সম্বন্ধে খুব একটা জানতে পারিনি। জন্ম সম্ভবতঃ ১৯৪৭ সালে। কলকাতায় কালীধন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন ও পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন নিয়ে বিএসসি পাশ করেছিলেন বলে শুনেছি। এক সময় বামপন্থী আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন বলে জানি।

ওনার জনবিজ্ঞান আন্দোলনে ভূমিকার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল পুরুলিয়ার পতিত জমি উদ্ধার ও তা নিয়ে প্রচার ও গবেষণা। এই কাজ তিনি শুরু করেন সত্তরের দশকে পুরুলিয়ার ফকিরডিহ নামক একটি জায়গায়। সেখানে তিনি গিয়ে থাকতেন। এই ফকিরডির কাছে একটি পতিত জমিতে এক সময় বনাঞ্চল ছিল। কিন্তু একটি বাঁধ নির্মানের জন্য গাছ কেটে ফেলা হলেও সেই বাঁধ আর নির্মিত হয়নি। বিপ্লবদা সেখানকার অধিবাসীদের সংগঠিত করে সম্পূর্ণ স্থানীয় সম্পদের উপর নির্ভর করে সেই বাঁধটি তৈরি করান ও বনাঞ্চল তৈরি করেন। তাঁর এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র পুরষ্কারে ভূষিত করা হয় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে।

স্কুল অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ ও বিপ্লব বসুকে আলাদা করা যাবে বলে মনে হয়না। এই সংগঠনটি তিনি ও তাঁর কয়েকজন সমমনষ্ক বন্ধু মিলে তৈরি করেন। এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেই সময় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার জন্য তাঁরা একটি পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন। সে পত্রিকায় বিপ্লব বসু নিয়মিত লিখতেন। পরে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলেও সংস্থাটি টিকে থাকে। আশির দশকের প্রথমভাগে আবার সংস্থা পুনরুজ্জিবীত হয় ও নানা ধরণের কাজ শুরু হয়। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতবর্ষে পরিবেশ সচেতনতা প্রচার অভিযান শুরু হয় যার পূর্বাঞ্চলের এবং পরে শুধু পশ্চিমবঙ্গের কাজের দেখাশোনার ভার পরে স্কুল অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের উপর। এই কাজের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হিসাবে পরিবেশ নিয়ে নানা ধরণের বই ও পুস্তিকা লেখা ও প্রচার করার কাজ শুরু হয়। এই কাজে বাংলায় নানা ধরণের পুস্তিকা রচনা করা হয়।

১৯৮২ সালে রিওডিজেনিরো তে যে বিশ্ব পরিবেশ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে তিনি ভারতের একজন প্রতিনিধি হয়ে যোগদান করেন। সেই সময় ভারত সরকার বিভিন্ন পরিবেশ সংক্রান্ত পরামর্শ দাতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

বিদেশে, বিশেষ করে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেখানে তিনি ভিজিটিং লেকচারার হিসাবে গিয়েছেন কয়েকবার। সেখানকার অধ্যাপক ডগলাসের সাথে তিনি স্কুল অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ ইউএসএ চ্যাপটার প্রতিষ্ঠা করেন।

 নব্বইয়ের দশকে স্কুল অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ ইকো ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্প নামক একটি বার্ষিক প্রোগ্রাম শুরু করে। এর মাধ্যমে স্থানীয় এলাকার পরিবেশ উন্নয়নের জন্য পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরে নিয়মিত পরিবেশ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হত। এই সব কর্মশাল মুল লক্ষ ছিল বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার পতিত জমি কীভাবে উদ্ধার করা যায় তা নিয়ে প্রযুক্তি বিনিময় ও ক্ষেত্র সমীক্ষা।

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইউএনডিপি এবং কেন্দ্রীয় সরকারে অর্থানুকূল্যে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। সেটি ছিল জলবিভাজিকাগুলিতে কীভাবে ভূমির ধারণক্ষমতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে স্থানীয় পরিবেশের উন্নতি করা যায় তাই নিয়ে গবেষণা এবং সাধারণ মানুষদের সাথে নিয়ে ক্ষেত্র সমীক্ষা ও তাদের কুশলতা বৃদ্ধি করা। তার মধ্যে জলসম্পদের সুস্থায়ী ব্যবহার ও একটি জলবিভাজিকার জলসম্পদের পরিমাণগত মূল্যায়ণ। এই কাজে প্রথম ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয় এবং বাংলা ভাষায় স্থানীয় এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদের মানচিত্র তৈরির কাজ শুরু হয়। এই কাজে একটি সফটওয়ার তৈরি করা হয় যার নাম দেওয়া হয় ইকোল্যান্ড। এই প্রতিটি কাজে অনেক বিশেষজ্ঞ হাত লাগালেও মূল ভাবনা ছিল বিপ্লব বসুর। এই কাজটি একটি রোল মডেল হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বীকৃতি লাভ করে। আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি স্বরূপ বিপ্লব বসুর একটি প্রতিবেদন ইউএনডিপির ২০০০ সালের মিলেনিয়াম ভলিউমে ছাপা হয়।

তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ ছিল, বিশেষ করে মানচিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহের জন্য ন্যাশনাল ন্যাশনাল অ্যাটলাসের অনেক বিজ্ঞানীকে তিনি নিজের কাজের সাথে যুক্ত করে নিয়েছিলেন। যাঁরা তাঁর সাথে কাজ করেছেন, ক্ষেত্র সমীক্ষার পদ্ধতি ডিজাইন করেছেন এবং মাঠে নেমে কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে কয়েকজন স্বনামধন্য ব্যক্তি হলেন অধ্যাপক এসপি দাশগুপ্ত (ন্যাশনাল অ্যাটলাস), ডঃ ত্রিদিব বসু (ন্যাশনাল অ্যাটলাস), ডঃ ডি কে দাস (মাইন্স এন্ড মিনারেল), অধ্যাপক গৌরিশঙ্কর ঘটক (প্রেসিডেন্সি কলেজ), অধ্যাপক অজিত কুমার সাহা (ম্যান এন্ড এনভায়রনমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা)।

বিপ্লব বসু মানুষ হিসাবে ছিলেন প্রকৃত পরিবেশ প্রেমী। প্রচুর পড়াশোনা করতেন ও লিখতেন।  প্রতি বছর হিমালয়ের কোনো নির্জন স্থানে গিয়ে সময় কাটিয়ে আসতেন। কবিতা লিখতেন। প্রকৃতি প্রেমের থেকে তিনি একটি কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন। যার নাম In Defece of Hope। এছাড়া একটি বেসরকারী সংস্থায় আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ও ভৌগোলিক তথ্যপ্রযুক্তিকে ক্ষেত্রসমীক্ষা ও পরিবেশ উন্নয়ণের কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তার অন্যতম পথিকৃৎ ও ছিলেন।

বৃক্ষমিত্র পুরস্কার ছাড়াও তিনি রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া গ্লোবাল ৫০০ পুরষ্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি রাষ্ট্রসংঘের NGLS নামক সংস্থার এসিয়া প্যাসিফিকের প্রতিনিধি ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁকে বিদেশে বিভিন্ন সম্মেলনে যেতে হত। ভারতীয় পরিবেশের অন্যতম কন্ঠস্বর হিসাবে তাঁর বিশ্ব পরিচিতি ছিল।

২০০৯ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।


Comments

Popular posts from this blog